জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছু নাম খুব সহজেই সামনে চলে আসে। আবার এর ফলে সেই বাড়ির ইতিহাসের অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। আলো-আঁধারির খেলায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরদের উজ্জ্বলতার অনেকটাই অন্ধকারে রয়ে যায়। বা তাঁরা অন্ধকারে থাকতেই পছন্দ করেন। আলো তাঁদের কাছে অস্তিত্বের এমন এক দিক যা তাঁরা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেন। কারণ তাঁরা অন্ধকারের গভীর থেকে সত্যের সন্ধান করেন। তাঁদের বিশেষত্ব হলো তাঁরা পথ হারানোর ভয় পান না। কারণ জীবন তাঁদের বারেবারে সাহসী হতে শিখিয়েছে। তাঁদের হৃদয় জোড়াসাঁকোর দালানের চাইতেও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাঁদের সহনশক্তি জোড়াসাঁকোর দেওয়ালের চাইতেও দৃঢ় হয়ে উঠেছে। আর তাঁদের মনোবল হয়ে উঠেছে প্রবল, যাকে কোনো শোকই পরাহত করতে পারে না। প্রফুল্লময়ী দেবী এরমই একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ পুত্র বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী ও বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা। এই উপন্যাসে প্রফুল্লময়ীর জীবনকে প্রকাশ করা হয়েছে তার স্বচ্ছল যাপনের ধারা ধরে। তবে এই স্বচ্ছলতা ধনসম্পদ সম্বন্ধিত নয়। এটি জীবনকে তার বিষাদপূর্ণ চলমানতার মধ্যে দেখেও অন্তরের গভীরতার অনুসন্ধানের তাগিদ সম্বন্ধিত।
এই উপন্যাসের দ্বারা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মানবীচর্চার ইতিহাসে প্রফুল্লময়ী দেবীও তাঁর স্থান পাবেন এই আশা করা যায়। তাঁর উজ্জ্বলতা সংকল্পের উজ্জ্বলতা। সাধারণ জীবনও অসাধারণ হয়ে ওঠে দৃঢ়চরিত্রের প্রকাশ দ্বারা। প্রফুল্লময়ী সেই দৃঢ়চরিত্রের অধিকারিণী যা অন্ধকারেও নিশ্চয়তা দান করে। বা বলা যেতে পারে অন্ধকারকে ভীতিদায়ক মনে করার গতানুগতিক ভাবনাকে দূর করে। এই উপন্যাস প্রফুল্লময়ী দেবীর মধ্যের সেই বিষাদকে প্রকাশ করেছে যা আত্ম-অনুসন্ধানের প্রফুল্লতাকেও সামনে এনেছে। এই উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সাথে বাংলার মানবীচর্চাও নতুন দিশা খুঁজে পাবে এই আশা করা যায়।